কিশোরীদের মানসিক প্রভাব ও কিশোরীদের মানসিক স্বাস্থ্য

বয়ঃসন্ধিকালে কিশোরীরা অনেক বেশি আবেগপ্রবণ হয়। এ সময় ছোট ছোট বিষয়ে তারা সহজে রেগে যায়। কখনো নিজের ক্ষতি করে ফেলে অথবা তাদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতাও দেখা যায়। এ সময় তাদের মাঝে ‘Identity crisis’ তৈরি হয় যে তারা আসলে বড় না ছোট। অভিভাবকরা অনেক সময়ই বলেন, তোমরা বড় হয়ে গেছ, এ কাজ তুমি কেন করছ; আবার অনেক সময়ই বলেন, তুমি এখনো ছোট এটা তোমার কাজ না। এ সময় একজন কিশোরী দ্বিধাদ্বন্দ্বে পড়ে যায় ‘এখন আমি কি করব’। বাইরের জগতের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনে অসুবিধা অথবা সম্পর্ক স্থাপন করলেও তা এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে অসুবিধায় পড়তে হয়। ৮-১১ বছর পর্যন্ত মেয়ে শিশুরা সাধারণত সমবয়সী ছেলেদের তুলনায় চঞ্চল, নির্ভীক হয়ে থাকে কিন্তু ঠিক ১২ বছরে পা রাখার সঙ্গে সঙ্গে তার মধ্যে চপলতার মাত্রা ধীরে ধীরে কমতে থাকে। কারণ এ সময় তারা ভবিষ্যতে তাদের ভূমিকা সম্পর্কে ধারণা পেতে আরম্ভ করে। যখনই চপলতা কমে আসে তখনই তারা বিষণ্ন, ক্লান্ত হয়ে পড়ে।

লিঙ্গ বৈষম’ ও কিশোরীর মানসিক প্রভাব :

অনেক ক্ষেত্রেই ছেলেদের খেলাধুলা বা পোশাক-পরিচ্ছদে কোনো বাধা না থাকলেও মেয়েদের ক্ষেত্রে বাধাটা প্রবল হয়ে ওঠে। পড়াশোনার ক্ষেত্রেও আরেক ধরনের বৈষম্য লক্ষ্য করা যায়, বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে বলা হয় মেয়েদের লেখাপড়ার দরকার নেই। এতে একজন কিশোরীর মনের ওপর চাপ পড়ে তারা আত্মবিশ্বাস হারায়। তারা ভুলে যায়, নিজে কি পারে এবং কী পারে না। এ সময় আত্মবিশ্বাসের যে ঘাটতি তৈরি হয় তার জন্য ভবিষ্যতে তাদের প্রতি পদে পদে মাশুল গুনতে হয়। পরিবারের সঙ্গে দূরত্ব, মনোমালিন্য তৈরি হয়। অনেক সময় তারা রেগে গিয়ে এমন কাজ করে বসে যা তাদের জন্য ক্ষতিকর।

কৈশোরে পিতা-মাতার সঙ্গে দ্বন্দ্ব : দ্বন্দ্ব অনেক বিষয়ে হয়ে থাকে। যেমন : পড়ালেখা, বন্ধু নির্বাচন, নির্দিষ্ট রুটিনে না থাকা, হাত খরচ, ছেলে বন্ধু থাকা, জীবনের লক্ষ্য নির্বাচন ইত্যাদি। এর কারণ সাধারণত ব্যক্তিত্ব, সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা না থাকা, সহজে রেগে যাওয়া অথবা বাবা-মার স্বৈরাচারী আচরণ, বাবা-মার কিশোরী সন্তানের সঙ্গে বোঝাপড়ার সমস্যা, তার মনোদৈহিক পরিবর্তন সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা না থাকা, প্রথম সন্তানের ক্ষেত্রে অভিভাবকদের পূর্ব অভিজ্ঞতা না থাকা, বাবা-মার নিজস্ব শারীরিক বা মানসিক সমস্যা, বাবা-মায়ের মধ্যকার দ্বন্দ্ব, বাবা-মার সময় দিতে না পারা অথবা বাবা-মার নিজস্ব অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে নিজের সন্তানকে সেই পথে পরিচালনা করা।

বয়ঃসন্ধিতে শারীরিক পরিবর্তন সম্পর্কিত আলোচনা

বয়ঃসন্ধিতে প্রতিটা মানুষের হরমোনজনিত পরিবর্তনের কারণে কিছু শারীরিক পরিবর্তন  ঘটে। এ বিষয়ে পারিবারিক পর্যায়ে খোলামেলা সময় উপযোগী আলোচনা করা প্রয়োজন। সময়ের আগে এবং সময়ের পরে দুটোই বিপদের কারণ হতে পারে। যদিও এ বিষয়গুলো পাঠ্যপুস্তক এবং শিক্ষাক্রমের অন্তর্ভুক্ত করা মতবিরোধের কারণ, তবুও এসব বিষয় আলোচনা করা এবং সঠিক তথ্য দেওয়া প্রতিটা অভিভাবক এমনকি শিক্ষক-শিক্ষিকার কর্তব্য। বয়ঃসন্ধিতে এসব বিষয়ে নানা আগ্রহ তৈরি হয় এবং সে বিষয়ে বন্ধু-বান্ধবের সঙ্গে আলোচনা করে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই মানুষ ভুল তথ্য বা অপব্যাখ্যা পায়। ছোটবেলা থেকে একটি শিশুকে তার শরীরের স্পর্শকাতর অঙ্গগুলো সম্পর্কে ধারণা দেওয়া উচিত, পিতা-মাতা বা অভিভাবক ব্যতীত অন্য যে কেউ সেই অঙ্গে স্পর্শ করলে তবে কী করণীয় সেই সম্পর্কে শিক্ষা দেওয়া উচিত। মেয়েদের জীবনে আরেকটা অস্বস্তিকর সময় হলো যখন তার প্রথম মাসিক আরম্ভ হয়। এ সময় মায়ের উচিত মেয়েকে মাসিক সম্পর্কে সম্যক ধারণা দেওয়া। এ সময় মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে অভিভাবকদের যত্নবান হতে হবে।